বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বিধবা সুফিয়া
- আপডেট সময় : ০৪:৩৩:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বজুড়ে যখন নিরাপদ বাসস্থান ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব বসতি দিবস পালিত হচ্ছে, ঠিক তখন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত এলাকায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন পার করছেন সুফিয়া আক্তার নামের এক বিধবা। স্বামী নুরুন্নবী ও একমাত্র ছেলে মবিনকে হারানোর পর সুফিয়া এখন নিজের বসতভিটা থেকেই উচ্ছেদ হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জমির আইনি রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও দেবর ও স্বজনদের ধারাবাহিক হুমকি, বাধা এবং জবরদখলের শিকার হয়ে তিনি আজ গৃহহীন।
ভুক্তভোগী সুফিয়া বর্তমানে তার প্রবাসী মেয়ের দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এই বিরোধের এক পর্যায়ে তাঁর বসতঘরটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। গত রোববার (৪ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, যে স্থানে সুফিয়ার ঘর ছিল, সেখানে এখন একটি নতুন টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সুফিয়ার ভাষ্যমতে, তাঁর দেবর নিজাম উদ্দিন এই ঘরটি তুলেছেন এবং বাড়ির প্রবেশমুখে টিনের গেট দিয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন, যাতে তিনি নিজ ভিটায় ঢুকতে না পারেন।
স্থানীয় ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী, চৌদ্দশত মৌজার ১১৭০ নম্বর খতিয়ানে সুফিয়ার স্বামী ও দেবরসহ অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের মোট ১ একর ২৭ শতাংশ জমি ছিল। নুরুন্নবী ও তাঁর ছেলে মবিনের মৃত্যুর পর বিআরএস ২৫-২৪৯৩ নম্বর খতিয়ান মূলে সুফিয়া ও তাঁর চার মেয়ে রেবা সুলতানা, মালা আক্তার, রত্না আক্তার এবং স্বপ্নার নামে মোট ৩০ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত হয়। সুফিয়ার অভিযোগ, কাগজে মালিকানা থাকলেও বাস্তবে তিনি এই জমির ২ শতাংশ জায়গাও ব্যবহার করতে পারছেন না। রেকর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চৌদ্দশত মৌজার ১১৭০ নম্বর খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে সুফিয়ার প্রয়াত স্বামী নুরুন্নবী, দেবর নিজাম উদ্দিনসহ অন্য ওয়ারিশদের মোট ১ একর ২৭ শতাংশ জমি ছিল। সুফিয়া বলেন, কাগজে ৩০ শতাংশের মালিক হলেও বাস্তবে মাত্র ২ শতাংশ জায়গায় একটি ঘর তোলার সুযোগও তিনি পাচ্ছেন না।
উচ্ছেদের বিষয়ে সুফিয়া জানান, দেবর নিজাম উদ্দিন, চাচাতো দেবর হারিছ মিয়া ও নিজাম উদ্দিনের জামাতা মামুন মিয়া মিলে তাঁর ঘর ভেঙে মালামাল নিয়ে গেছেন। এ সময় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দেবর নিজাম উদ্দিন। তিনি পাল্টা দাবি করেন, ওই জমিতে সুফিয়ার কোনো অধিকার নেই এবং সুফিয়া বর্তমানে যে স্থানে থাকছেন, সেটিও তাঁর নিজস্ব জায়গা। নিজাম উদ্দিনের জামাতা মামুন মিয়া বিষয়টি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, সুফিয়ার প্রতি মায়া থাকলে যেন তাঁকে অন্য কেউ আশ্রয় দেয়। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সুফিয়ার প্রতি এত মায়া থাকলে তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেওয়া হোক।
চৌদ্দশত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতাহার আলী জানান, অসহায় সুফিয়া ও তাঁর চার মেয়ে বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একাধিকবার সালিশ হয়েছে এবং সব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সুফিয়ার পক্ষেই রায় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ কোনো সিদ্ধান্তই মানছেন না।
পরবর্তীতে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান জানান, দুই পক্ষকেই জেলা পরিষদে ডেকে কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন থাকায় আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সুফিয়াকে সেখানে অবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে সুফিয়ার অভিযোগ, জেলা পরিষদ থেকে ফেরার পরই তাঁকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করে সেখানে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
আইনি সহায়তা দেওয়া কিশোরগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী দোলন কুমার আচার্য্য নিশ্চিত করেছেন যে, জমির দলিলে সুফিয়া আক্তারের মালিকানা স্পষ্ট। তবুও দেবরদের বাধার কারণে তিনি ভিটায় ফিরতে পারছেন না। নিজের সবটুকু হারিয়ে সুফিয়া এখন প্রবাসী মেয়ের দুই নাতনিকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিবাহিত মেয়েদের সংসারে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি নিজের ভিটায় ফিরে একটি ছোট ঘরে মাথা গুজে শান্তিতে বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়েছেন।
সুফিয়ার এই দুর্দশা কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে ভূমি বিরোধ ও আইনি জটিলতার এক কঠিন চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বিশ্ব বসতি দিবসে নিরাপদ আবাসনের অধিকার নিয়ে যখন নানামুখী কার্যক্রম চলে, তখন এই অসহায় নারীর পরিস্থিতি স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সুফিয়ার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























