স্তন ক্যানসারের সাথে লড়াই ও চিকিৎসকের নতুন জীবনবোধ
- আপডেট সময় : ০৯:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলো অন্যদের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা। কিন্তু নিজের স্তনে ধরা পড়া একটি চাকা যখন বাস্তবে ক্যানসার হিসেবে শনাক্ত হলো, তখন রোগীকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন আমার কাছে পুরোপুরি নতুন এক অভিজ্ঞতায় ধরা দিল। এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত অসুস্থতার গল্প নয়, বরং চিকিৎসক থেকে রোগী হয়ে ওঠার এক অনন্য রূপান্তর। একজন চিকিৎসক যখন নিজেই সেই রোগে আক্রান্ত হন, যে রোগের চিকিৎসা তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন, তখন অভিজ্ঞতাটি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। একই সঙ্গে ভাবছিলাম—প্লাস্টিক সার্জারির মধ্যেই আরও সুপার-স্পেশালাইজড হতে চাই; কিন্তু কোন ক্ষেত্রটি হবে আমার নিজের। তারপরও মনে হতো, নারী চিকিৎসক হিসেবে ব্রেস্ট সার্জারিতে অনেকেই এগিয়ে আসবেন; আমি বরং হ্যান্ড সার্জারিকে নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিই। আমাদের দেশে তখনো এই ক্ষেত্রটি তুলনামূলকভাবে অবহেলিত।
২০১৯ সাল থেকেই আমার স্তনে একটি ছোট চাকা অনুভব করছিলাম। শুরুতে সেটিকে নিরীহ মনে হয়েছিল। আলট্রাসাউন্ড গাইডেড এফএনএসি করার পর রিপোর্ট এসেছিল ‘ফাইব্রোসিস্টিক চেঞ্জ’। ২০২০ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় একটি হ্যান্ড সার্জারি কনফারেন্সে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আমি তখন বেশ উৎসাহিত ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে কনফারেন্সটি বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশে ফিরে আসি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
সেই কঠিন সময়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনজন অ্যাডভান্সড ব্রেস্ট ক্যানসার রোগীকে দেখার পর নিজের শরীরের সেই চাকাটি নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদয় হয়। এবার কোনো অবহেলা না করে কোর বায়োপসি করার সিদ্ধান্ত নিই। প্যাথলজিস্ট বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া সেই রিপোর্ট এবং পরবর্তী সিনিয়র প্যাথলজিস্টের রিভিউতে স্তন ক্যানসারের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। আমার স্তনের টিউমার বায়োলজি ছিল ইআর/পিআর পজিটিভ এবং এইচইআর২ নেগেটিভ।
দশ বছর আগে আমার বাবার স্টেজ-৩ ক্যানসার চিকিৎসার লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস ছিল, প্রয়োজন হলে আমি লড়ে যাব। আমার স্বামী ও সহকর্মীদের সহযোগিতায় একজন সিনিয়র সার্জিক্যাল অনকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার যাত্রা শুরু হয়। অপারেশনের পরবর্তী সময়ে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, একজন রোগীর কথা বলার বা নিজের অনুভূতি বোঝানোর অসহায়ত্ব কতটা তীব্র হতে পারে, যা কোনো পাঠ্যপুস্তকেই শেখা সম্ভব নয়।
দীর্ঘ সাত মাসের কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির এই যাত্রা আমাকে শুধু ক্যানসারই জয় করতে শেখায়নি, বরং চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে রোগীর প্রয়োজন ও স্বপ্নের গুরুত্ব বুঝতে শিখিয়েছে। এখন আমার ক্লিনিকে কোনো রোগী এলে আমি কেবল ক্যানসার শনাক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিই না, বরং তাঁর পরিবার, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকেও পূর্ণ মনোযোগী থাকি। আমি এখন নিশ্চিত করি, প্রতিটি স্তন ক্যানসার রোগীকে যেন সঠিক তথ্যের পাশাপাশি সম্মান ও মানসিক সাহস দেওয়া হয়। আমার প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অর্ধেকেরও বেশি রোগী আসতেন স্তন-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে।
এখন কোনো রোগীর স্তনে সন্দেহজনক চাকা পাওয়া গেলে আমি আর কালক্ষেপণ করি না। প্রয়োজনে আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম এমনকি এমআরআই করাতে দ্বিধা করি না। কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক চাকা দেখলে শুধু ‘ফাইব্রোসিস্টিক’ ভেবে অপেক্ষা করাটা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমি এখন আমার রোগীদের স্পষ্টভাবে বোঝাই। ক্যানসার চিকিৎসার আগে বায়োলজি জানার অপরিহার্যতা এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের গুরুত্ব এখন আমার চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমি এখন চিকিৎসার শুরুতেই রোগী ও তাঁর পরিবারকে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিই। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন এবং কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা। কারণ, ক্যানসারের চিকিৎসা একজন চিকিৎসকের একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
নিজের এই যাত্রায় আমি জীবনকে নতুন করে বুঝেছি। আমরা প্রায়ই ভাবি, ক্যারিয়ার বা অন্য কোনো অর্জনের পর ভালোভাবে বাঁচব। কিন্তু ক্যানসার আমাকে শিখিয়েছে, জীবন ভবিষ্যৎ কোনো গন্তব্যে বসে নেই, বরং প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্তেই জীবন বিদ্যমান। ক্যানসার আমার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়। এই বোধ থেকেই আমি বর্তমানে ‘চট্টগ্রাম কল’ নামক একটি অলাভজনক ও মানবিক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছি। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে রোগীদের জন্য একটি সহমর্মিতাপূর্ণ ও বিশ্বমানের সেবার পরিবেশ তৈরি করাই এখন আমার মূল লক্ষ্য। পেশাগত জীবন ভালো চলছিল, একাডেমিক কাজ এগোচ্ছিল। তাই আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক অভিজ্ঞতার সুযোগ খুঁজছিলাম।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ





















