ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে ১৫ বছরের চুক্তি: বিক্ষোভের মুখে সরকার
- আপডেট সময় : ০৮:৩৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেল সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। দীর্ঘ ১৫ বছরের জন্য এই পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গতকাল আগারগাঁওয়ের ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে। চুক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, ঢাকায় নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
চুক্তি স্বাক্ষর পর্বে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে কোম্পানির চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম স্বাক্ষর করেন। এই কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ঢাকার ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে সিপিবি ও বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে এ সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর গাড়ি প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় এবং এতে সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে যে, এই চুক্তির ফলে টার্মিনালের মালিকানা বা মূল অবকাঠামো বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। জমি ও মূল সম্পদের মালিকানা সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি করে একে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতামূলক টার্মিনালে রূপান্তর করা। আমাদের বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে স্থিতিশীলতা আনা। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী বন্দরগুলোর তুলনায় কন্টেইনার জাহাজে অবস্থানের সময়, পণ্য খালাসে সময়, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। এসব সক্ষমতা বাড়াতেই আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম বাংলাদেশ সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে এই সুযোগ পাওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ ক্রমেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে এবং তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে এবং তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ কন্টেইনার পরিবহন সম্পন্ন হয়। একইসঙ্গে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এই অংশীদারিত্ব টার্মিনালের লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা দূর করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, বৈশ্বিক গতির সাথে তাল মিলিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যে এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বর্তমানে এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টার্মিনালের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করাও এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধনী বিনিয়োগ করবে। এর বিনিময়ে সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি হিসেবে পাবে, যার ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করা হবে। এছাড়া প্রতি ২০ ফুট কন্টেইনারের বিপরীতে গড় রাজস্বের ভিত্তিতে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি বা রাজস্ব অংশ পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আমাদের পরিচালনাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেবা দেয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে চাই। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো এমন একটি বন্দরব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আমরা যে মাত্রার বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে চাই, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য কোনো ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজেই। ফলে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সাথে এই চুক্তির কোনো মিল নেই, যেখানে দেশটিকে চীনা ঋণের চাপে পড়তে হয়েছিল। চুক্তিতে ট্রাফিক মূল্যায়ন, ঝুঁকি বণ্টন, মুদ্রাবিনিময়জনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মূল কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই) এবং উৎপাদনশীলতার লক্ষমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক জরিমানার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
নিয়োগকৃত জনবলের বিষয়ে সরকার নিশ্চিত করেছে যে, স্থানীয় জনবলকে ধারাবাহিকভাবে কাজে বহাল রাখা হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতায় তাদের যুক্ত করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করছে। বিদেশি অপারেটরের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারাই দায়িত্ব পালন করবে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও শ্রমিক অসন্তোষ ও নানা জটিলতায় তা স্থগিত ছিল, যা বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুনরায় চূড়ান্ত করল।
এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সচিবালয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাতে ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোন এবং রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো স্থাপনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগ্রহের কথা শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র: মানবজমিন
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























