ঢাকা ০১:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মব–সংস্কৃতি: জনরোষ নাকি পরিকল্পিত অরাজকতা?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৫:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের জনজীবনে জনতার হুটহাট সংগঠিত হয়ে ওঠার এই সংস্কৃতি এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন। এটি কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ধরা দেয়, আবার কখনো পরিণত হয় অন্ধ প্রতিশোধ নেওয়ার ভয়ংকর হাতিয়ারে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ এবং বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতিই মূলত এই মব-প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত জনতা যেমন খাদ্যগুদাম আক্রমণ করেছিল, তেমনি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে জনতার এই শক্তি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনতার ঐক্য ছিল মুক্তির শক্তি। গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—সবাই একত্র হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বঁ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’-এ জনতার মনোবিজ্ঞান নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, একটি জনসমষ্টির অংশ হওয়ার পর ব্যক্তি তার নিজস্ব যুক্তি ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ বা ব্যক্তিসত্তা লোপ। যখন কেউ ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ কমে যায় এবং আবেগের আতিশয্য তাকে যুক্তিহীন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করে। এই অবস্থায় মানুষ এমন সব সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে, যা ব্যক্তিগত জীবনে সে কল্পনাও করতে পারে না। জনতার এই রূপ কখনো আলোর দিশারী, আবার কখনো দহনকারী আগুনের মতো ধ্বংসাত্মক হয়। জনতার ভেতরে একধরনের সমষ্টিগত আবেগ কাজ করে, যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব যুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। লে বঁ-এর এই ধারণা, ফ্যাসিবাদী ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনেই ব্যবহৃত হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জনতার ভেতরে ব্যক্তি তার পরিচয় হারায়। ফলে সে এমন আচরণ করতে পারে, যা একা থাকলে কখনো করত না।

আমাদের সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। ২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তা এই মব-সংস্কৃতিরই বীভৎস প্রকাশ। এছাড়া চোর সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে নিরপরাধ মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনাও বহু পুরোনো। এমনকি ধর্ষণ বা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় না থেকে জনতা যেভাবে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তা আইনের শাসনের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

রাজনৈতিক অংগনেও মব-সংস্কৃতির ছায়া স্পষ্ট। যদিও রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও দলীয় লড়াইয়ের সাথে হঠাৎ সংগঠিত মব-সন্ত্রাসের পার্থক্য রয়েছে, তবু অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের ওপর ভিত্তি করে হঠাৎ জনতা যে উন্মাদনায় ফেটে পড়ে, তার পেছনে অনেক সময় স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকে। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী কেন্দ্রিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বইয়ের দোকানে হামলা কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রসংগঠনের হামলা একই ধারার বহিঃপ্রকাশ। এখানে দলীয় স্লোগান বা নেতৃত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে জনতার আবেগ ও অন্ধ হিংস্রতা।

কিছু মহল বর্তমান সময়ে ‘প্রেশার গ্রুপ’ তত্ত্বের আড়ালে এই মব-সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে প্রেশার গ্রুপ এবং মব-সন্ত্রাস এক নয়। প্রেশার গ্রুপ সুসংগঠিত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দাবি আদায় করে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও উদ্দেশ্য থাকে স্পষ্ট। বিপরীতে, মব-সংস্কৃতি হলো নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, যা যুক্তি ও ন্যায়বোধকে বিসর্জন দেয়। যখন আন্দোলনের রাশ শিথিল হয়ে যায়, তখনই তা মব-ভায়োলেন্সে রূপান্তর ঘটে।

এই প্রবণতা রুখতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ গঠন, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। মব-সংস্কৃতি হলো সমাজের সেই ক্ষত, যা আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার পরিচায়ক। জনতার শক্তিকে যদি সঠিক পথে চালিত করা না যায়, তবে তা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হওয়ার পরিবর্তে সমাজকে ধংসের দিকে নিয়ে যাবে। সময়ের সাথে সাথে এই অশুভ প্রবণতা রোধ করা এখন জাতির জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মব–সংস্কৃতি: জনরোষ নাকি পরিকল্পিত অরাজকতা?

আপডেট সময় : ১২:২৫:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের জনজীবনে জনতার হুটহাট সংগঠিত হয়ে ওঠার এই সংস্কৃতি এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন। এটি কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ধরা দেয়, আবার কখনো পরিণত হয় অন্ধ প্রতিশোধ নেওয়ার ভয়ংকর হাতিয়ারে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ এবং বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতিই মূলত এই মব-প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত জনতা যেমন খাদ্যগুদাম আক্রমণ করেছিল, তেমনি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে জনতার এই শক্তি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনতার ঐক্য ছিল মুক্তির শক্তি। গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—সবাই একত্র হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বঁ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’-এ জনতার মনোবিজ্ঞান নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, একটি জনসমষ্টির অংশ হওয়ার পর ব্যক্তি তার নিজস্ব যুক্তি ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ বা ব্যক্তিসত্তা লোপ। যখন কেউ ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ কমে যায় এবং আবেগের আতিশয্য তাকে যুক্তিহীন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করে। এই অবস্থায় মানুষ এমন সব সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে, যা ব্যক্তিগত জীবনে সে কল্পনাও করতে পারে না। জনতার এই রূপ কখনো আলোর দিশারী, আবার কখনো দহনকারী আগুনের মতো ধ্বংসাত্মক হয়। জনতার ভেতরে একধরনের সমষ্টিগত আবেগ কাজ করে, যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব যুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। লে বঁ-এর এই ধারণা, ফ্যাসিবাদী ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনেই ব্যবহৃত হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জনতার ভেতরে ব্যক্তি তার পরিচয় হারায়। ফলে সে এমন আচরণ করতে পারে, যা একা থাকলে কখনো করত না।

আমাদের সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। ২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তা এই মব-সংস্কৃতিরই বীভৎস প্রকাশ। এছাড়া চোর সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে নিরপরাধ মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনাও বহু পুরোনো। এমনকি ধর্ষণ বা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় না থেকে জনতা যেভাবে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তা আইনের শাসনের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

রাজনৈতিক অংগনেও মব-সংস্কৃতির ছায়া স্পষ্ট। যদিও রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও দলীয় লড়াইয়ের সাথে হঠাৎ সংগঠিত মব-সন্ত্রাসের পার্থক্য রয়েছে, তবু অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের ওপর ভিত্তি করে হঠাৎ জনতা যে উন্মাদনায় ফেটে পড়ে, তার পেছনে অনেক সময় স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকে। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী কেন্দ্রিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বইয়ের দোকানে হামলা কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রসংগঠনের হামলা একই ধারার বহিঃপ্রকাশ। এখানে দলীয় স্লোগান বা নেতৃত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে জনতার আবেগ ও অন্ধ হিংস্রতা।

কিছু মহল বর্তমান সময়ে ‘প্রেশার গ্রুপ’ তত্ত্বের আড়ালে এই মব-সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে প্রেশার গ্রুপ এবং মব-সন্ত্রাস এক নয়। প্রেশার গ্রুপ সুসংগঠিত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দাবি আদায় করে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও উদ্দেশ্য থাকে স্পষ্ট। বিপরীতে, মব-সংস্কৃতি হলো নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, যা যুক্তি ও ন্যায়বোধকে বিসর্জন দেয়। যখন আন্দোলনের রাশ শিথিল হয়ে যায়, তখনই তা মব-ভায়োলেন্সে রূপান্তর ঘটে।

এই প্রবণতা রুখতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ গঠন, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। মব-সংস্কৃতি হলো সমাজের সেই ক্ষত, যা আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার পরিচায়ক। জনতার শক্তিকে যদি সঠিক পথে চালিত করা না যায়, তবে তা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হওয়ার পরিবর্তে সমাজকে ধংসের দিকে নিয়ে যাবে। সময়ের সাথে সাথে এই অশুভ প্রবণতা রোধ করা এখন জাতির জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box