ইউরোপের রঙিন স্বপ্নের আড়ালে মানবপাচারের জাল
- আপডেট সময় : ০৯:০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে
ইউরোপের রঙিন স্বপ্নের আড়ালে মানবপাচারের জাল
ইউরোপে গেলে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে—এমন রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণ-তরুণী ও পরিবারকে প্রলুব্ধ করছে দালালচক্র। ভালো চাকরি, মোটা বেতন, বসবাসের বৈধ কাগজপত্র এবং স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নতুন জীবন গড়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ইউরোপমুখী করা হচ্ছে। তবে এই স্বপ্নের পথ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণ, প্রতারণা, ভুয়া ভিসা ও মানবপাচারের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেকে সেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বন্দিত্ব ও চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
নিরাপত্তা জনিত কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করা সিলেটের এক দম্পতি জানান, ছাত্র ভিসায় প্রথমে যুক্তরাজ্যে গেলেও পরে নানা আইনি জটিলতায় তারা ব্যর্থ হয়েছেন। বৈধতার আশায় পর্তুগাল ও স্পেনে গিয়েও তারা বারবার বাধার মুখে পড়েছেন।
পড়ুন>>ফ্রান্সে কেন ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা?
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও পাসপোর্টের নামের বানানজনিত জটিলতায় নথিপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় তাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অনুসন্ধানে কথা হয়েছে ইউরোপে অবস্থানরত কয়েকটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত নামগুলো ছদ্মনাম। এরপর পর্তুগাল ও স্পেনে বৈধতা পাওয়ার আশায় যান। প্রতিবারই নতুন কাগজ, নতুন নিয়ম এবং নতুন খরচ। কিন্তু বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াতের খরচ প্রতিমাসেই দিতে হয়।
মৌলভীবাজারের অন্য এক দম্পতির ভাষ্যমতে, দেশ থেকে বৈধতার আশায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে গিয়ে সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। ঋণের ভারে ন্যুব্জ এই পরিবারগুলো বারবার দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের ইদ্রিস মিয়া ও শান্তা ইসলাম জানান, ইউরোপে পৌঁছানোর পর নিয়মিত কাজ পাওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে দৈনিক আয়ের নিশ্চয়তা নেই, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়।
পড়ুন>>গাজীপুরে প্রেমিকের বাসায় তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু, গ্রেপ্তার শান্ত
কাগজপত্রহীন হওয়ার কারণে অনেকে রেস্টুরেন্ট বা নির্মাণকাজে নামমাত্র পারিশ্রমিকে শ্রম দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ শ্রমিকদের তুলনায় তাদের পারিশ্রমিক অনেক কম, অথচ কাজ হারানোর ভয়ে তারা প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এছাড়া নিজের নামে বাসা ভাড়া নিতে না পারায় ছোট ঘরে গাদাগাদি করে সাবলেটে বাস করতে হচ্ছে তাদের, যা তাদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই দুর্ভোগ ইউরোপ পৌঁছানোর আগেই শুরু হয়। লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। ২০২৫ সালে দুই বাংলাদেশিকে ৪২ দিন আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করেছিল। এমনকি ২০২৬ সালেও লিবিয়া থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ইতালির প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া শেনজেন ভিসার মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে, যেখানে একজনের কাছ থেকেই অগ্রিম ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দালালরা একেকজনের কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের জন্য। কর্মসংস্থানের এই বাস্তবতাই তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আরো পড়ুন>>ডিলারশিপ চূড়ান্তের আগেই দোকানে সার বিক্রেতার সাইনবোর্ড
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যদিও সফলতার হার অত্যন্ত সীমিত। বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, ইউরোপের স্বপ্ন বন্ধ করা নয়, বরং নিরাপদ অভিবাসনের পথ নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের দায়িত্ব হলো অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দালালচক্রের নেটওয়ার্ক ভাঙা এবং দেশে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, যাতে একজন তরুণকে স্বপ্নপূরণের নামে দালালের দরজায় দাঁড়াতে না হয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেও সফল হননি। ইউরোপের বিভিন্ন বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে নিয়মিত কাজ ও বাসার সন্ধানে পোস্ট দিতে দেখা যায়।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ


























