সংবাদপত্র শিল্পের সংকট ও উত্তরণের পথ: কেন এটি একটি জাতীয় বিনিয়োগ?
- আপডেট সময় : ০১:৫৭:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
সংবাদপত্র শিল্পের সংকট ও উত্তরণের পথ: কেন এটি একটি জাতীয় বিনিয়োগ?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সামাজিক অগ্রগতির দীর্ঘ পথচলায় সংবাদপত্র কেবল একটি শিল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি জাতির বিবেক এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সত্যের পক্ষে অটল থাকা এই মাধ্যমটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো নিরন্তর তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রের বহু ইতিবাচক অর্জনের পাশাপাশি ভুল-ত্রুটি সংশোধনের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বর্তমান বিশ্বকে অনেক গবেষক ‘Attention Economy’ বা মনোযোগের অর্থনীতি হিসেবে অভিহিত করছেন। তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থার হার বর্তমানে ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
একই সঙ্গে সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতাও বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রথাগত সংবাদপত্রের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তবে এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে একটি সুযোগও বটে, কারণ ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম বড় সংকট হলো দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা। কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অনেক মেধাবী সাংবাদিক এই পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ডেটা জার্নালিজম কিংবা আন্তর্জাতিক মানের রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ। একজন সাংবাদিক যখন প্রতিনিয়ত নিজের জীবিকা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন তাঁর কাছ থেকে গভীর অনুসন্ধানী কাজ আশা করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নত দেশগুলো সংবাদপত্রকে কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখে না। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো সংবাদপত্রকে গণতান্ত্রিক অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে। ফলে ডিজিটাল যুগেও এসব দেশে সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা অটুট রয়েছে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ প্রদানে বাধ্য করেছে এবং কানাডা স্থানীয় সাংবাদিকতা রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা চালু করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্রকে জনস্বার্থমূলক সেবা হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হয়, যা প্রমাণ করে যে বাজার ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দিলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদপত্র শিল্পের এই সংকট কেবল মালিক, সম্পাদক কিংবা সাংবাদিকদের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের তথ্য-নিরাপত্তা, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং নাগরিক সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু।
রাস্তা, সেতু কিংবা বন্দরের মতো অবকাঠামোর মতোই স্বাধীন ও টেকসই সংবাদমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। এই অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে সুশাসন ব্যাহত হয়, জবাবদিহিতা হ্রাস পায় এবং গুজব সত্যের জায়গা দখল করে নেয়।
পরিশেষে বলা যায়, সংবাদপত্রকে টিকিয়ে রাখা কোনো খাতভিত্তিক দাবি নয়; এটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দিয়েছে যে, সংবাদপত্র দুর্বল হলে শুধু একটি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং একটি জাতির সত্য জানার অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। মা/জ/ন




















