সূচনা: যুগ এতটাই পাল্টে গেছে যে মাছ চাষ করার জন্য এখন আর পুকুর বা ডোবার দরকার পরে না। আধুনিক যুগে জমির স্বল্পতার জন্য মাছ চাষ এখন ঢুকে গেছে ঘরের ভিতর। নির্দিষ্ট কলাকৌশল আর প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ঘরের ভিতর চৌবাচ্চাতে চাষ করা যাচ্ছে মাছ। এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে বায়োফ্লক। একোয়াকালচার পদ্ধতির উন্নত সংস্করণ হচ্ছে মাছের নয়া এই প্রযুক্তি। বায়োফ্লক টেকনোলজি ব্যবহার করে অল্প জমিতে অধিক পরিমাণ মাছ উৎপাদন সম্ভব। ‘বায়োফ্লক’ প্রযুক্তির জনক ইজরায়েলি বিজ্ঞানী ইয়ান এভনিমেলেচ। তাহলে আসুন প্রথমে জানি বায়োফ্লক টেকনোলজিটা আসলে কি?
বায়োফ্লক কি?
বায়ো শব্দটি গ্রীক বায়োস থেকে এসেছে, যার অর্থ জীবন। আর ফ্লক মানে আলতোভাবে লেগে থাকা কনার সমষ্টি। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্যের পুষ্টি থেকে পুন ব্যবহার যোগ্য খাবার তৈরি করা হয়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বায়োফ্লক প্রযুক্তি মাছ চাষের একটি টেকসই এবং পরিবেশগত ভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে চৌবাচ্চার পানিতে ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব ও শৈবালের সমম্বয়ে পাতলা একটি আস্তরণ তৈরি হয়। যা পানিকে ফিল্টার করে। পানি থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় ক্ষতিকর উপাদানগুলি শোষণ করে নেয় এবং এর প্রোটিন সমৃদ্ধ যে উপাদান গুলো থাকে সেগুলো মাছ খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে অনুজীব মুলত দুটি প্রধান ভূমিকা পালন করে-
১.অণুজীব পানিতে বিদ্যমান নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ যৌগ গুলোকে ব্যবহার করে অণুজীব প্রোটিনে রূপান্তর করার মাধ্যমে পানির গুণাগুণ সঠিক মাত্রায় বজায় রাখে।
২.এই প্রযুক্তি খাদ্য রূপান্তর হার এবং মাছ চাষে খাদ্য ব্যয় কমিয়ে চাষের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি করে।
জেনে নিন >>আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড মরিচ চাষ পদ্ধতি
বায়োফ্লক প্রযুক্তিতে কি মাছ চাষ করা যায়?
বায়োফ্লক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে সচরাচর যেসব মাছ চাষ করা হচ্ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তেলাপিয়া, রুই, শিং, মাগুর, পাবদা, গুলশা ও চিংড়ীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। তবে, যারা বায়োফ্লক প্রযুক্তিটি প্রথমবারের মত ব্যবহার করতে যাচ্ছেন তারা অবশ্যই প্রথমে তেলাপিয়া, শিং ও মাগুর মাছ দিয়ে চাষ শুরু করবেন। তবে
অন্যান্য দেশে তেলাপিয়া ও চিংড়িই মূলত বায়োফ্লক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় চিংড়ি চাষ।
বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের সুবিধা সমূহ:
বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের অসুবিধা সমূহ:
জেনে নিন >>সূর্যমুখী চাষ করে অধিক লাভবান হউন
বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য যা লাগবে:
চৌবাচ্চা বা ট্যাংক বা হাউজ, লোহার খাঁচা, ত্রিপল, আউটলেট, টিডিএস মিটার, পিএইচ মিটার, অ্যামোনিয়াম টেস্ট কিড, অক্সিজেনের জন্য মটর, বিদ্যুৎ, মাছের পোনা, খাদ্য ও প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি।
বায়োফ্লক পদ্ধতিতে পানি ব্যবস্থাপনা ও ফ্লক তৈরীর কলাকৌশল:
প্রথমে ট্যাংক ব্লিচিং পাউডার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। এর পর নির্বাচিত পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে পানি প্রবেশ করাতে হবে। পানিতে আয়রনের মাত্রা ০.২ ppm এর বেশি হলে পানি থেকে আয়রন দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। আয়রন দূর করার জন্য প্রতি টন পানিতে ২৫- ৩০ ppm হারে ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগের পর ১০ – ১২ ঘন্টা একটানা বাতাস সরবরাহ করতে হবে। এর পর ৫০ ppm হারে ফিটকিরি প্রয়োগ করে আরও ১২ ঘন্টা পানিতে অনবরত বাতাস সরবরাহ করতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর পানিতে ১০০ ppm হারে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ( CaCO3) চুন প্রয়োগ করে বাতাস সরবরাহ নিয়মিত করতে হবে। এর পর নির্বাচিত পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে পানি প্রবেশ করাতে হবে। এ সময় পানির যে গুনাবলীর দিকে নজর রাখতে হবে তা নিচে দেয়া হলো:
পানিতে যেভাবে ফ্লক তৈরি করবেন
চাষ ট্যাংকের ১২ ভাগের ১ ভাগ পানি নিয়ে পানিতে ১০০০ ppm হারে আয়োডিন ছাড়া লবণ প্রয়োগ করতে হবে। লবণ প্রয়োগের পর TDS পরীক্ষা করে নিতে হবে। বায়োফ্লকের জন্য ১৪০০ – ১৮০০ ppm, TDS থাকা ভাল। যদি লবণ প্রয়োগের পর কাঙ্খিত TDS পাওয়া না যায়, তা হলে কম পরিমাণলবণ প্রয়োগ করে আদর্শ মাত্রায় TDS রাখতে হবে। এর পর প্রথম ডোজে ৫ ppm প্রেবায়োটিক, ৫০ ppm চিটাগুড়, ৫ ppm ইস্ট, পানি প্রতি টনের জন্য ১ লিটার, একটি প্লাস্টিকের বালতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে ৮- ১০ ঘন্টা কালচার করে প্রয়োগ করতে হবে। ২য় দিন থেকে ১ppm প্রোবায়োটিক, ৫ ppm চিটাগুড়, ১ ppm ইস্ট, প্রতি টনের জন্য ১ লিটার পানি দিয়ে কালচার করে প্রতি দিন প্রয়োগ করতে হবে।
• ppm for “parts per million” and it also can be expressed as milligrams per liter (mg/L).
বায়োফ্লক পর্যবেক্ষণ:
ট্যাংক তৈরি:
বায়োফ্লকের জন্য স্থায়ী বা অস্থায়ী দুই ধরনের ট্যাংকই চাইলে তৈরি করতে পারেন। ইট সিমেন্ট দিয়ে কিংবা স্টীলের পাত দিয়ে কিভাবে স্থায়ী ট্যাংক তৈরি করতে হয় সেটা সবাই জানেন। এখানে আমরা জানবো কিভাবে ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী ট্যাংক তৈরি করতে হয়।প্রথমে গ্রেড রড দিয়ে ট্যাংকের বৃত্তাকার খাঁচাটি তৈরি করতে হবে। যেই স্থানে ট্যাংকটি স্থাপন করা হবে সেই জায়গাতে খাঁচার পরিধির সমান করে সিসি ঢালাই দিতে হবে। বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে পানির একটি আউটলেট পাইপ স্থাপন করতে হবে। এরপর খাঁচাটিকে ঢালাই মেঝের উপর স্থাপন করে মাটিতে গেঁথে দিতে হবে। মেঝের মাটি শক্ত ও সমান হলে ঢালাইয়ের পরিবর্তে পরিধির সমান করে পুরু পলিথিন বিছিয়েও মেঝে প্রস্তুত করা যায়। এরপর উন্নতমানের তারপুলিন বা ত্রিপল দিয়ে সম্পূর্ণ খাঁচাটি ঢেকে দিতে হবে। তার উপর পুরু পলিথিন দিয়ে আচ্ছাদিত করে তাতে পানি মজুদ করতে হবে।
এখানে আপনাদেরকে জানিয়ে রাখি ৩০০০ লিটার পানি ধারনের জন্য ট্যাংকের সাইজ হবে ৬ফিট ব্যাস এবং ৪.৫ ফিট উচ্চতা, ৫০০০ লিটারের জন্য ৮ফিট ব্যাস এবং ৪.৫ ফিট উচ্চতা, ৭৫০০ লিটারের জন্য ১০ফিট ব্যাস এবং ৪.৫ ফিট উচ্চতা, ১০০০০ লিটারের জন্য ১৩ ফিট ব্যাস এবং ৪.৫ ফিট উচ্চতা।তারপর ট্যাংকের সাথে এয়ার পাম্পের সংযোগ ঘটাতে হবে পানিতে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য। প্রতি ১০ হাজার লিটার পানির জন্য ৭০ থেকে ৮০ ওয়াটের এয়ার পাম্প লাগবে এবং সাথে ৮ থেকে ১০টি এয়ার স্টোন প্রয়োজন হবে।
জেনে নিন >>সহজেই লাভজনক পদ্ধতিতে লাউ চাষ করুন
বায়োফ্লক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষে যে সব বিষয় নজর রাখতে হবে:
বায়োফ্লক পদ্ধতিতে ট্যাংকে অধিক পরিমাণে মাছ রাখা হয়। তাই ট্যাংকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়। আর ট্যাংকে সব সময় অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ লাগবে। তা না হলে ট্যাংকের অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে সব মাছ এক সাথে মারা যেতে পারে। সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা ট্যাংকে অক্সিজেন সরবরাহ না করা হলে সব মাছ মারা যেতে পারে। তাই বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে।
মন্তব্য করুন