ঢাকার রায়েরবাজারে শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী জরাজীর্ণ গদিঘর
- আপডেট সময় : ০৪:৪৬:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার শেরেবাংলা রোডের পাশে মোহাম্মদীয়া আলিম মাদ্রাসার গলির কাছে অবস্থিত ‘গদিঘর’ নামক এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কালো একটি সাইনবোর্ডে অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘গদিঘর, স্থাপিত ১৯১৮ ইং’। শত বছরের পুরোনো এই ভবনটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ ফুট, প্রস্থে ৩০ ফুট এবং এর দেয়ালগুলো প্রায় ১ ফুট ৮ ইঞ্চি চওড়া। বর্তমানে এই ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালে শেওলা জমেছে এবং চারপাশ লতাগুল্মে ঢেকে গেছে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা গদিঘর দেখতে গিয়েছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। নামটি হয়েছে শতাধিক বছরের পুরোনো একতলা একটি ভবনকে কেন্দ্র করে। সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে বা রিকশায় যাওয়ার পথে পুরোনো স্থাপনাটির দিকে তাকিয়েছি বহুবার। কিন্তু মোহাম্মদীয়া আলিম মাদ্রাসা গলির মুখের পাশে শেরে বাংলা রোড–লাগোয়া ভবনটিতে কোনো নামফলকই নেই। লোনা ধরা দেয়ালের কোথাও কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। দালানের পেছনের অংশে ভঙ্গুর দেয়ালে গজিয়েছে পরগাছা ও লতাগুল্ম। মাঠ-সংলগ্ন পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে কয়েকটি বড় বড় গাছ। পশ্চিমে পুরোনো বুড়িগঙ্গা আর উত্তরে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছিল সেই খাল। খালের ওপরই গড়ে উঠেছে সাদেক খান রোডের একাংশ। দ্রুত এই এলাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়।
একসময় এই এলাকার মৃৎশিল্পের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গদিঘর ব্যবহৃত হতো। ১৮৭৬ সালে রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে খানবাহাদুর সৈয়দ আবদুল লতিফের পরামর্শে পুনর্গঠিত হয়। ১৯১৮ সালে নির্মিত এই ভবনটি ছিল সেই ট্রাস্টের কার্যালয়, যেখানে মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের টোল আদায় করা হতো। এখান থেকে পণ্যসামগ্রী ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হতো, যা এলাকায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। অনেকের মতো সেই তাকানোর মধ্যে ছিল একরাশ কৌতূহল। দিনের বিভিন্ন সময় শিশু-কিশোরেরা মাঠে খেলাধুলা করে। একসময় রায়েরবাজারের পৌর মার্কেটের মসজিদ (মসজিদুল আরাফাহ)-লাগোয়া খালে একটি নৌঘাট ছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসিসহ নানা তৈজসপত্র নিয়ে এই ঘাটে এসে ভিড়ত ছোট–বড় নৌযান। এ পর্যায়েই ট্রাস্টটির উদ্যোগে ১৯১৮ সালে নির্মাণ করা হয় গদিঘর ভবন। সেই সঙ্গে বাড়ে ট্রাস্টের অর্থনৈতিক সক্ষমতা।
তবে এই দালানটির সাথে জড়িয়ে আছে একটি বেদনাবহ ও রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৬৪ সালে রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গদিঘরে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও মন্দিরের সভাপতি বিশ্বনাথ পালের বর্ণনায় জানা যায়, তৎকালীন সময়ে এলাকার হিন্দু প্রতিবেশীদের রক্ষায় এগিয়ে আসা জিন্নাত আলী ও মাহেন্দ্র পাল এই দাঙ্গায় প্রাণ হারান। জিন্নাত আলীর স্ত্রী ফুলনেছা বিবিও দাঙ্গাকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ১১ দিন পর মারা যান। এই আত্মত্যাগের স্মরণে কবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘জীবন কথা’ গ্রন্থটি জিন্নাত আলী ও তাঁর পরিবারের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলেন। শেষে কৌতূহল আর ধরে রাখতে না পেরে ১১ সেপ্টেম্বর সশরীর গিয়ে হাজির হই। মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় ক্রিকেটও খেলেন স্থানীয় তরুণ-যুবকেরা।
১৩ শতক জমির ওপর অবস্থিত এই প্রাঙ্গণটি বর্তমানে নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। মাঠের একপাশে পাকা বারান্দায় পথচারীরা বিশ্রাম নেন, আবার এই মাঠটি স্থানীয়দের খেলাধুলা ও উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। তবে বর্তমানে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক সুখেন পাল জানান, ট্রাস্টের অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে এবং তা পুনরুদ্ধারে আদালতে মামলা চলছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জিন্নাত আলীর নাতি মাহি বি সিনহা। এসব গাছের ছায়ায় ভাদ্রের ভরদুপুরেও প্রাঙ্গণটি বেশ স্নিগ্ধ-শীতল। ছোট প্রাঙ্গণটির এক পাশে পাকা বারান্দায় ক্লান্ত পথচারী কিংবা শ্রমজীবী মানুষকে প্রায়ই বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ভালোভাবে চলার পর একপর্যায়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা-মোকদ্দমায় ট্রাস্টের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।
গদিঘর রক্ষার দাবিতে স্থানীয় সচেতন মহল এবং যুবসমাজ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাবিনা আলম জানান, একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করতে সরেজমিনে পরিদর্শন ও জেলা প্রশাসনের মতামতের প্রয়োজন। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
ইতিহাসে উল্লিখিত আছে যে, ১৯৮৮ সাল থেকে তিন বছর ভবনটি মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের সময় তা বিলুপ্ত হয়। বর্তমানে বৈশাখী যুব সংগঠন নামের একটি ক্লাব এই ভবনটির দেখভাল করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন জানান, তারা গদিঘর কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এখন দেখার বিষয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণে শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























