ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি
- আপডেট সময় : ০৭:২৪:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৪ ৭০৮ বার পড়া হয়েছে
ঢেঁড়স চাষ পদ্ধতি
অনেকেই ঢেঁড়স বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে এর ব্যাপক চাহিদা আছে। বাণিজ্যিক চাষ করতে না পারলে আপনি চাইলে আপনার বাসার পরিত্যক্ত জায়গা, ছাদে, বারান্দায় অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে এই ঢেঁড়সের চাষ করতে পারেন।
ঢেঁরসের কিকি পুষ্টিগুণ রয়েছে ?
বেশ পছন্দে একটি সবজি হচ্ছে ঢেঁড়স। পুষ্টিগুণে অন্যন্য ঢেঁড়স স্বাস্থ্যের পক্ষেও বেশ উপকারী। ঢেঁড়সে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য গুণাগুণ রয়েছে। এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন এ ও অন্যান্য ধরণের অনেক উপাদান।
ঢেঁড়সে প্রতি ১০০ গ্রামে ভক্ষণযোগ্য অংশে আমিষ (১.৮ গ্রাম) ভিটামিন-সি (১৮ মিলিগ্রাম) খনিজ পদার্থ বিশেষ করে ক্যালশিয়াম (৯০ মিলিগ্রাম), লোহা (১ মিলিগ্রাম) ও আয়োডিন রয়েছে।
কখন ঢেঁড়স রোপনের সঠিক সময়?
বছরের যে কোনো সময়েই আপনি ঢেঁড়স চাষ করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে শীতকালের শেষ থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম পর্যন্ত ঢেঁড়স এর বীজ লাগানো উত্তম। এ সময় গাছ লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
কোন মাটিতে ঢেঁড়স ভালো হবে?
ঢেঁড়স চাষের জন্য সবথেকে দোআঁশ অথবা বেলে দোআঁশ মাটি ভালো। এই মাটি ঢেঁড়স চাষের জন্য উপযোগী। এমন জমিই সাধারণত আমাদের নির্বাচন করতে হবে। চারা লাগানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মাটি উর্বর ও ঝুরঝুরে হয়।
ঢেঁড়সের উন্নত জাত :
আমাদের দেশে নানা ধরণের ঢেঁড়স রয়েছে। তার মধ্যে কিছু জাত আছে উন্নত মানের। যেমন পুশা শাওনী, কাবুলী ডোয়ার্ফ, লক্ষৌ ডোয়ার্ফ, লং গ্রীন, লং হোয়াইট, পেন্টাগ্রীণ এগুলো অনেক ভালো জাতের।
কখন কোন জাতের ঢেঁড়স চাষ করতে হয়?
রাজা : তীব্রশীত ব্যতীত সারা বছর চাষ করা যায়।
বেবী : তীব্রশীত ব্যতীত সারা বছর চাষ করা যায়।
সৌমি : মে থেকে আগষ্ট এবং নভেম্বর থেকে মার্চসৌমি গ্রীণ : তীব্রশীত ব্যতীত সারা বছর চাষ করা যায়।
কচি : অক্টোবর থেকে এপ্রিল।
বীজের হার: প্রতি একরে ২ কেজি।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগের নিয়ম:
প্রতি শতকে সারের পরিমাণ- গোবর ৭৫ কেজি,
সরিষার খৈল ১.৭৫ কেজি, ইউরিয়া ২৩০ গ্রাম, টিএসপি ৩৫০ গ্রাম, এমও পি ২৩০ গ্রাম, বোরণ ৫০গ্রাম।
সার প্রয়োগের নিয়ম:
জমি তৈরি করার সময় ইউরিয়া সার বাদে বাকি সব সার মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সার মেশানের ১০-১৫ দিন পর জমিতে ঢেঁড়শ বীজ বপন করতে হয়। ইউরিয়া সার সমান দু‘কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম কিস্তিতে চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর এবং ২ য় কিস্তিতে দিতে হবে চারা
বীজ বপনের পদ্ধতি :
বীজ থেকে ঢেঁড়স চাষ করার সময়, আপনি প্রথম যে জিনিসটি লক্ষ্য করবেন তা হল যে বীজগুলি অন্যান্য সবজির তুলনায় অনেক বড় এবং তাই এটি হ্যান্ডেল করা বেশ সহজ। রোপণের আগে, ঢেঁড়সর বীজ সামান্য গরম পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন। ঢেঁড়সের বীজ দুইভাবে লাগানো যায়।
সরাসরি বাগানের মাটিতেও লাগাতে পারেন বা আপনি প্রথমে ওই বীজ থেকে চারা বানিয়ে তারপর সেগুলি বাগানে প্রতিস্থাপন করতে পারেন। আপনি যদি দ্বিতীয় বিকল্পটি বিবেচনা করে থাকেন সেক্ষেত্রে বাজারে যেসব চারা ট্রে পাওয়া যায় সেগুলি ব্যবহার করতে পারেন। মাটির বদলে কোকো কয়ার বা পিট মস ব্যবহার করুন।পরে চারা তৈরী হলে সেগুলি মাটিতে রোপণ করুন।
রোপণের আগে মাটির সাথে কম্পোস্ট মিশিয়ে নিতে ভুলবেন না। ঢেঁড়স খরা এবং তাপ খুব ভালভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। প্রতি সপ্তাহে এক ইঞ্চি-গভীর জল ঢেঁড়স চাষের জন্য আদর্শ। মাটিতে জল সংরক্ষণ করতে জৈব মালচ ব্যবহার করুন। ঢেঁড়স গাছগুলি সাধারণত বড় হয় এবং তারা তাদের শাখাগুলিও ছড়িয়ে দেয়। তাই গাছের উচ্চতা 6” হলে আপনাকে কিছু চারা তুলে ফেলতে হবে। দুটি ঢেঁড়স গাছের মধ্যে কমপক্ষে 18 থেকে 24 ইঞ্চি ব্যবধান রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
যদি গাছপালা বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না পায়, তাহলে ঢেঁড়সের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কম্পোস্ট ব্যবহার করলে সার যোগ করতে হবে না। ঢেঁড়স গাছগুলি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে যখন শুঁটি আসতে শুরু করে। শুঁটি 3 থেকে 4 সপ্তাহের মধ্যে গজাতে পারে।
প্রথমে নিচের দিকে ঢেঁড়স তৈরী হয় এবং পরবর্তী কালে তা উপরের দিকে যেতে থাকে। সাধারণত একটি ঢেঁড়স গাছ 6 থেকে 8 ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এক্ষেত্রে সারি থেকে সারি ৪৫ সেমি এবং প্রতি সারিতে ৩০ সেমি পর পর বীজ বপন করা হয়। ২-৩ সেমি গভীরে প্রতি গর্তে ২ টি করে বীজ বপন করতে হবে এবং চারা গজানোর ৭ দিন পর সুস্থ চারাটি রেখে বাকিটা তুুলে ফেলতে হবে। বীজ বপনের পর প্রয়োজনীয় সেচ আবশ্যক।
ঢেঁড়সের রোগ ও পোকামাকড় দমন ও কীটনাশক প্রয়োগ:
হলুদ শিরা মোজাইক ভাইরাস:
হলুদ শিরা মোজাইক ভাইরাস আক্রান্ত চারা গাছের পাতা এবং এর বাহক পোকা। ঢেঁড়স গাছ বাহক পোকার মাধ্যমে ভাইরাস আক্রান্ত হয়। তাই বাহক পোকা দমন-ই ভাইরাস ঠেকানোর একমাত্র উপায়।
টোপাম্যাক রস শোষণকারী পোকা ভাইরাস এর বাহক পোকা দমনে অত্যন্ত কার্যকর। টোপাম্যাক ৭০ ডব্লিউ জি (প্রতি কেজিতে ৭০০ গ্রাম ইমিডাক্লোপ্রিড বিদ্যমান) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৫ শতক জমির জন্য ২ গ্রাম, একর প্রতি মাত্রা ৪০ গ্রাম, হেক্টর প্রতি মাত্রা ১০০ গ্রাম।
প্রবাহমান গুণসম্পন্ন হওয়ায় দ্রুত গাছের ভিতরে প্রবেশ করে ফলে আক্রান্ত ফসলের ভিতরে থাকা পোকা মারা যায়। টোপাম্যাক স্প্রে করার ১৪ দিনের মধ্যে ফসল খাওয়া যাবেনা। সকল ধরণের বালাইনাশক বিকেলে ব্যবহার করা উত্তম।
চারা গাছে কাটুই পোকার আক্রমণ:
কাটুই পোকার আক্রমণ ঠেকাতে (ক্লোরপাইরিফস ও সাইপারমেথ্রিন বিদ্যমান) জাতীয় কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে। এই কীটনাশক পাকস্থলীক্রিয়া গুণসম্পন্ন হওয়ায় গাছের ভিতরে থাকা পোকা রস শোষণের ফলে মারা যায়।
স্পর্শক গুণসম্পন্ন হওয়ায় ইহা পোকার গায়ে লাগা মাত্রই পোকা মারা যায়। শ্বাসরোধ ক্রিয়া গুণসম্পন্ন হওয়ায় ইহা মাটিতে বসবাসকারী ক্ষতিকারক পোকার শ্বাসরোধ করে পোকাকে মেরে ফেলে। স্প্রে করার ১৪ দিনের মধ্যে ফসল খাওয়া যাবেনা। সকল ধরণের বালাইনাশক বিকেলে স্প্রে করা উত্তম।
ঢেঁড়স এর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা;
ঢেঁড়স এর ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা দমনে ব্যবহার এমামেকটিন বেনজয়েট গোত্রের কীটনাশক নির্দেশিত ভাবে ব্যবহার করতে হবে। প্রবাহমান গুণসম্পন্ন হওয়ায় দ্রুত গাছের ভিতরে প্রবেশ করে ফলে আক্রান্ত ফসলের ভিতরে থাকা পোকা মারা যায়।
স্পর্শক গুণসম্পন্ন হওয়ায় ইহা পোকার গায়ে লাগা মাত্রই পোকা মারা যায়। স্থানীয়ভাবে অনুপ্রবেশযোগ্য ও পাকস্থলীক্রিয়া গুণসম্পন্ন হওয়ায় ইহা পোকার স্নায়ুতন্ত্রের “কোলিন এস্টারেজ” এনজাইমের কার্যকারিতাকে বাঁধাগ্রস্ত করে পোকাকে প্যারালাইজড করে ফেলে এবং পরবর্তীতে পোকা মারা যায়। কীটনাশক স্প্রে করার ১৪ দিনের মধ্যে ফসল খাওয়া যাবেনা। সকল ধরণের বালাইনাশক বিকেলে ব্যবহার করা উত্তম।
চারা গাছের ঢলে পড়া / গোড়া পচা রোগ:
চারা গাছের ঢলে পড়া / গোড়া পচা রোগ দমনে ব্যবহার প্রোপামোকার্ব জাতীয় ঔষধ মাটির উপরের অংশ এবং গোড়া সহ সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। ১০ লিটার পানিতে ৫ শতক জমির জন্য ১০ মিলি, একর প্রতি ২০০ মিলি, হেক্টর প্রতি মাত্রা ৫০০ মিলি।
প্রবাহমান গুণসম্পন্ন হওয়ায় দ্রুত গাছের ভিতরে প্রবেশ করে ফলে আক্রান্ত ফসলে দ্রুত রোগের আক্রমণ থেমে যায়। প্রতিরোধক গুণসম্পন্ন হওয়ায় রোগ আসার আগে ব্যবহার করলে ফসলে রোগের আক্রমণ হয়না। প্রতিষেধক গুণসম্পন্ন হওয়ায় রোগ আসার পরে ব্যবহার করলেও ফসলে রোগের আক্রমণ বাড়তে দেয়না।
আবহাওয়া ও রোগের তীব্রতার উপর ভিত্তি করে ৭-১৪ দিন পরপর গাছ ভিজিয়ে বাতাসের অনুকূলে এই বালাইনাশক স্প্রে করুন। চারাগাছের যেকোনো রোগের অপ্রতিদ্বন্দী ভাবে কাজ করে। এটি স্প্রে করার ৭-১০ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়। সকল ধরণের বালাইনাশক বিকালে ব্যবহার করা উত্তম।
অধিক ফলন পেতে ন্যাপ এসিটিক এসিড, নাইট্রো বেনজিন ও জিবরেলিক এসিড দিয়ে তৈরি জৈব উদ্দীপক হরমোন প্রতি ২০-২৫ দিন পর পর স্প্রে করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।
যত্ন ও পরিচর্যা:
গাছের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেন আগাছা না জন্মায়। আগাছা জন্মালে তা উঠিয়ে ফেলতে হবে। দেখতে হবে পানি শুকিয়ে গেলে টবের মাটি যেন ফেটে না যায়।
ঢেঁড়স সংগ্রহ:
কাচা অবস্থায় ঢেঁড়স সংগ্রহ করতে হবে। যদি বেশি বড় হয় তবে ঢেঁড়স এর কোনো স্বাদ থাকে না এবং এটা আঁশ হয়ে যায়। বীজ বপনের দু´মাস পরেই ঢেঁড়স পাওয়া যায়। ঘন ঘন ঢেঁড়শ তুললে গাছে বেশি পরিমাণে ঢেঁড়স আসে।




















